Thursday, June 18, 2026

 


বাইরে পরম শান্ত, সাধারণ পল্লীবধূর বেশ মুখে চিরন্তন মাতৃত্বের স্নিগ্ধ হাসি কিন্তু এই চাদরের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মহাশক্তি তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের আধ্যাত্মিক সহধর্মিণী, শ্রীমা সারদাদেবী স্বামী বিবেকানন্দ যাঁকে বলতেনজ্যান্ত দুর্গা সাধারণ মানুষের চোখে তিনি কেবলই এক দয়াময়ী মা, কিন্তু বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে তাঁর ভক্ত সন্তানদের কাছে তিনি ধরা দিয়েছিলেন দেবীমূর্তিতেআগের আলোচনায় মায়ের জগদ্ধাত্রী রূপে প্রকাশ হওয়ার বিবরণের পর   আজ আমরা আলোচনা করব শ্রীমার জীবনের এমন চারটি অলৌকিক ঘটনা, যেখানে তাঁর কালী, সরস্বতী, দুর্গা এবং বগলা রূপের প্রকাশ ঘটেছিল
প্রথম ঘটনাটি তেলোভেলোর মাঠের। দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে যাওয়ার পথে মা সারদা একাকী এক দুর্গম, জনহীন মাঠে ডাকাত দম্পতির মুখোমুখি হন। সাধারণ কোনো নারী হলে ভয়ে মূর্ছা যেতেন। কিন্তু মা ছিলেন অচলা, শান্ত। মায়ের এই অদ্ভুত মৃদুতা, নির্ভীকতা এবং ঐশী শক্তি দেখে সেই হিংস্র ডাকাত দম্পতির হৃদয় মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়ে যায়

মনস্তাত্ত্বিক আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মায়ের ভেতরের মহাশক্তি তখন জাগ্রত হয়েছিল। ডাকাত দম্পতি মায়ের মাঝে সাধারণ কোনো মানবীকে দেখেনি; তারা মায়ের মাঝে সাক্ষাৎ দেবী কালীর বিশ্বরূপ দর্শন করেছিল। মায়ের মাতৃভাব হিংস্রতাকে জয় করে পরম আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল

শ্রীমা যে কেবল শক্তিরূপা ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন শুদ্ধ জ্ঞান বিদ্যার প্রতীক। সুরেন্দ্রনাথ সেন নামে এক ভক্ত স্বপ্নে এক পরম উজ্জ্বল, জ্যোতির্ময় দেবীমূর্তির দর্শন পান। সেই দেবী তাঁকে একটি মন্ত্র প্রদান করেন এবং নিজের পরিচয় দেনসরস্বতীবলে

পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ যখন দীক্ষা নেওয়ার জন্য জয়রামবাটীতে শ্রীমার কাছে যান, তখন এক অলৌকিক সত্য তাঁর সামনে উন্মোচিত হয়। মা সারদা তাঁকে ঠিক সেই মন্ত্রটিই দীক্ষায় দান করেন, যা তিনি স্বপ্নে পেয়েছিলেন। সুরেন্দ্রনাথ স্তব্ধ হয়ে উপলব্ধি করেনতাঁর স্বপ্নদৃষ্ট বাগদেবী সরস্বতী এবং এই শান্ত পল্লীবধূ মা সারদা আসলে সম্পূর্ণ অভিন্ন। মা- স্বয়ং জ্ঞানদায়িনী সরস্বতী

১৯১২ সাল। বেলুড় মঠে মহাসমারোহে দুর্গাপূজা চলছে। সেই সময় মা সারদা নিজেকে মৃন্ময়ী প্রতিমার সাথে একাত্ম করে অনুভব করেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ যথার্থই বুঝেছিলেন মায়ের আসল স্বরূপ, তাই তিনি মা-কেজ্যান্ত দুর্গাবলে ডাকতেন। মায়ের এই দুর্গারূপ কেবল ভাবজগতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ভক্তরা তা স্বচক্ষে দেখেছেন

হরিপদ মাঝি নামে একনিষ্ঠ এক ভক্ত যখন গভীর ভক্তিভরে নিজের ইষ্টমন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন, তখন মায়ের কক্ষের সামনে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। তিনি দেখেন, মা সারদা আর সাধারণ মানবী শরীরে নেই; তাঁর সম্মুখে স্বয়ং মহাশক্তি দেবী দুর্গা দশভুজা রূপে দাঁড়িয়ে আছেন। এটি প্রমাণ করে, মা- ছিলেন সনাতন দুর্গোৎসবের মূল প্রাণশক্তি

মা যেমন দয়াময়ী, প্রয়োজনবোধে তিনি তেমনই রুদ্ররূপিনী। কামারপুকুরে থাকাকালীন হরিশ নামে এক বিকৃত-মস্তিষ্ক ব্যক্তি মায়ের পিছু নেয় এবং অসদুপায়ে তাঁকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। সেই চরম সংকটের মুহূর্তে মায়ের চিরপরিচিত শান্ত রূপ নিমেষে বিলীন হয়ে যায়মা এক ভয়ঙ্কর রুদ্র মূর্তি ধারণ করেন এবং হরিশকে মাটিতে চেপে ধরেন। জীবনীকার এবং আধ্যাত্মিক গবেষকদের মতে, এটি ছিল মায়েরবগলামুখীরূপ। দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী বগলা হলেন শত্রুর বা কুপ্রবৃত্তির স্তম্ভনকারিণী। মা সারদা সেদিন দেখিয়েছিলেন যে, সন্তানের আসুরিক কুপ্রবৃত্তিকে কঠোরহস্তে দমন করতে তিনি দেবী বগলার মতোই সংহার রূপ ধারণ করতে পারেন
কালী, সরস্বতী, দুর্গা কিংবা বগলাএই ভিন্ন ভিন্ন রূপ আসলে এক পরম শক্তিরই বিভিন্ন প্রকাশ। মা সারদাদেবী তাঁর মর্ত্যলীলায় সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করে গেছেন, কিন্তু তাঁর ভেতরের এই চার রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে তিনি স্বয়ং আদিশক্তি। আজ এই পবিত্র আলোচনা আপনাদের কেমন লাগল, কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। মায়ের চরণে প্রণাম জানিয়ে আজকে এখানেই শেষ করছি। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

 

No comments:

Post a Comment