পর্দার আড়ালের এক মহান আলো: স্বামী স্মরণানন্দজী মহারাজের কিছু অজানা কাহিনী
রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের ১৬তম সংঘাধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী স্মরণানন্দজী মহারাজ ছিলেন এক মহান আধ্যাত্মিক সাধক ও কর্মযোগী। ২০২৪ সালের ২৫শে মার্চ তিনি ৯৫ বছর বয়সে মহাসমাধিতে লীন হন। যাঁর মুখের এক চিলতে সৌম্য হাসিতে শান্ত হয়ে যেত হাজারো ভক্তের মন, যাঁর প্রশাসনিক দক্ষতায় বিশ্বজুড়ে পরিচালিত হতো রামকৃষ্ণ মিশন—তাঁর দীর্ঘ জীবনের ত্যাগের ইতিহাস অনেকেরই জানা। কিন্তু তাঁর শান্ত, অন্তর্মুখী ও মাটির কাছাকাছি থাকা জীবনের এমন কিছু দিক রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে আজও অজানা।
১. জন্ম ও শৈশবের অদ্ভুত মেলবন্ধন
অনেকেই হয়তো জানেন না যে মহারাজ আদতে দক্ষিণ ভারতের মানুষ ছিলেন। ১৯২৯ সালে তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুর জেলার আন্দামি গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। তবে অতি অল্প বয়সে মাতৃহারা হওয়ায় তাঁর শৈশব কাটে পিসির কাছে। পরবর্তীতে বাবার কাজের সূত্রে তিনি মহারাষ্ট্রের নাসিকে চলে যান। ফলে তামিল পরিবারে জন্মেও মারাঠি ও হিন্দি সংস্কৃতির আবহে তিনি বড় হয়ে ওঠেন। এই বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাই হয়তো পরবর্তীতে তাঁকে ভারতের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যাওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা দিয়েছিল।
২. সরকারি চাকরি ছেড়ে সন্ন্যাস জীবন বেছে নেওয়া
চেন্নাই থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর নাসিকের মর্যাদাপূর্ণ 'ইন্ডিয়ান সিকিউরিটি প্রেস'-এ চাকরি জীবন শুরু করেছিলেন তরুণ স্মরণানন্দ। তাঁর ভবিষ্যৎ ছিল সুরক্ষিত, জীবন ছিল ছক কষা। কিন্তু যাঁর অন্তরে বৈরাগ্যের আগুন জ্বলছে, তাঁকে কি সংসারী ছকে বাঁধা যায়? মাত্র ২০ বছর বয়সে মুম্বইয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের সংস্পর্শে আসার পর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র ২২ বছর বয়সে, ১৯৫২ সালে তিনি সরকারি চাকরি ও সংসারের সমস্ত মায়া ত্যাগ করে মুম্বই আশ্রমে যোগ দেন।
৩. দীক্ষা ও গুরুদেবের পবিত্র আধ্যাত্মিক ধারা
এই মুম্বই আশ্রমেই তরুণ স্মরণানন্দের জীবনে আসেন তাঁর আধ্যাত্মিক কাণ্ডারী। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ৭ম সংঘাধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী শঙ্করানন্দজী মহারাজের কাছ থেকে তিনি পবিত্র মন্ত্রদীক্ষা লাভ করেন।
ব্রহ্মচর্য ও সন্ন্যাস দীক্ষা
১৯৫৬ সালে তিনি ব্রহ্মচর্য ব্রতে দীক্ষিত হন এবং তাঁর নাম হয় 'ব্রহ্মচারী প্রমোদচৈতন্য'। এর ঠিক চার বছর পর, ১৯৬০ সালের জানুয়ারি মাসে, স্বামী শঙ্করানন্দজী মহারাজের কাছ থেকেই তিনি সন্ন্যাস দীক্ষা লাভ করেন এবং তাঁর নতুন নাম হয় 'স্বামী স্মরণানন্দ'।
শ্রীরামকৃষ্ণের পার্ষদদের সাথে সংযোগ
এখানে একটি চমৎকার সংযোগ রয়েছে। স্বামী শঙ্করানন্দজী ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের মানসপুত্র স্বামী ব্রহ্মানন্দজী মহারাজের সরাসরি শিষ্য। সেই সূত্রে স্বামী স্মরণানন্দজী মহারাজ সরাসরি শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম সারির পার্ষদদের সেই পবিত্র আধ্যাত্মিক ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
৪. ১৮ বছরের নীরব সাধনা ও অসামান্য রসবোধ
মহারাজ অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত, গভীর চিন্তাবিদ এবং একজন ভালো লেখক ছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো প্রচারের আলো চাননি। স্বামী বিবেকানন্দ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা 'প্রবুদ্ধ ভারত'-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে কলকাতার অদ্বৈত আশ্রমে তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর কাজ করেছেন। পর্দার আড়ালে থেকে নীরবে তিনি এই পত্রিকার মানোন্নয়নে অসাধারণ অবদান রেখেছিলেন।
বাইরে থেকে মহারাজকে অত্যন্ত গম্ভীর ও শান্ত মনে হলেও, তাঁর ঘনিষ্ঠ ভক্ত এবং সহকর্মী সন্ন্যাসীরা জানতেন তাঁর অসাধারণ রসবোধের কথা। খুব সাধারণ ঘটনার মধ্যেও তিনি কৌতুক খুঁজে পেতেন। তাঁর মৃদু হাস্যরস ও তাৎক্ষণিক চটজলদি উত্তর বহু গম্ভীর পরিস্থিতিকে মুহূর্তের মধ্যে হালকা করে দিত।
৫. সাংগঠনিক দক্ষতা ও আধুনিক আধ্যাত্মিক দর্শন
মহারাজ সস্তা প্রচার বা জাঁকজমক একদম পছন্দ করতেন না। নীরবে কাজ করে যাওয়াই ছিল তাঁর স্বভাব। আজ চেন্নাইয়ের রামকৃষ্ণ মঠের যে বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরটি আমরা দেখি, তার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল তাঁরই তত্ত্বাবধানে। দীর্ঘ ১০ বছর তিনি রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের সাধারণ সম্পাদক (General Secretary) হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিশ্বব্যাপী এই আন্দোলন পরিচালনা করেছেন।
তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শন কোনো কঠিন বা জটিল তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। তিনি স্বামীজীর "শিবজ্ঞানে জীব সেবা" আদর্শে গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, ভগবানকে কেবল মন্দিরে বা ধ্যানে খোঁজা ভুল; মানুষের সেবা করাই ঈশ্বরের আসল উপাসনা। তিনি ভক্তদের বলতেন, রান্নাবান্না, পড়াশোনা কিংবা অফিসের কাজ—সবই যদি নিখুঁতভাবে ও ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করে করা যায়, তবে সেটাই হবে শ্রেষ্ঠ কর্মযোগ। তিনি অন্ধবিশ্বাসের বিরোধী ছিলেন এবং আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা, কর্মমুখী দক্ষতা ও বিশেষ করে নারী ক্ষমতায়নের পক্ষে আজীবন সওয়াল করে গেছেন।
৬. বেলুড় মঠের দিনলিপি ও মহারাজের মহাসমাধি
মহারাজ যখন বেলুড় মঠে সংঘাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন, তখন তাঁর দৈনিক রুটিন ছিল ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা। প্রতিদিন ভোরে উঠে তিনি দীর্ঘ সময় জপ-ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। সকালের দিকে তিনি দেশ-বিদেশ থেকে আসা শত শত ভক্তদের দীক্ষা দিতেন এবং সাধারণ মানুষের সাথে দেখা করতেন।
জীবনের শেষ দিকে বার্ধক্যজনিত কারণে মহারাজের শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকরা তাঁকে সম্পূর্ণ বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের ব্যাকুলতা দেখে মহারাজ নিজেকে আটকে রাখতে পারতেন না। শারীরিক কষ্ট উপেক্ষা করেও তিনি হুইলচেয়ারে বসে জানলার পাশে এসে ভক্তদের দর্শন দিতেন এবং হাত তুলে আশীর্বাদ করতেন।
২০২৪ সালের প্রথম দিকে যখন তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়, তখন তাঁকে কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়। অবশেষে, ২০২৪ সালের ২৫শে মার্চ, সোমবার রাত 8টা ১৪ মিনিটে ৯৫ বছর বয়সে শ্রীমৎ স্বামী স্মরণানন্দজী মহারাজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং মহাসমাধিতে লীন হন। ২৬শে মার্চ বেলুড় মঠের গঙ্গার ঘাটে, যেখানে স্বামী বিবেকানন্দ এবং অন্য পার্ষদদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল, সেখানেই সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চন্দন চিতায় বিদায় জানানো হয় এই নীরব কর্মযোগীকে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে সমাজ ও মানুষের সেবা করা যায়।
No comments:
Post a Comment