Thursday, June 4, 2026

"দু-চারবার নাড়াচাড়া কিন্তু খেতেই হবে"------শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস


 

ঠাকুর বলতেন, যারা ভগবানকে ধরে থাকে তারা বিষম শোকেও একেবারে তলিয়ে যায় না, তবে "দু-চারবার নাড়াচাড়া কিন্তু খেতেই হবে" শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের এই অমর বাণীটি মানব জীবনের এক পরম মনস্তাত্ত্বিক আধ্যাত্মিক সত্যকে প্রকাশ করে শ্রীম কথিত 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত' গ্রন্থে ঠাকুরের এই ধরনের বহু উপদেশ সংকলিত রয়েছে, যা মানুষের বাস্তব জীবনের টানাপোড়েন এবং ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের গভীর সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করে

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বাস্তববাদী সাধক ছিলেন। তিনি জানতেন যে, রক্ত-মাংসের শরীরে এই সংসারে বাস করতে গেলে দুঃখ, শোক, রোগ এবং অশান্তি অবশ্যই আসবে।

এখানে  "তলিয়ে না যাওয়ার" অর্থ হলো  যিনি ঈশ্বরকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন বা 'ধরে থাকেন', তিনি জীবনের তীব্র ঝড়ে বা বিষম শোকেও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন না। তাঁর অন্তরে একটি সুপ্ত শক্তির আধার থাকে, যা তাঁকে চরম হতাশায় ডুবে যাওয়া (যেমনআত্মহনন বা মানসিক ভারসাম্য হারানো) থেকে রক্ষা করে।

আর "দু-চার বার নাড়াচাড়া" খাওয়ার অর্থ: ঈশ্বরভক্ত হলেই যে জীবনে কোনো দুঃখ আসবে নাঠাকুর এই অলৌকিক বা অবাস্তব সান্ত্বনা দেননি। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী শারীরিক জাগতিক কষ্ট আসবেই, ভক্তকেও সেই ধাক্কা বা 'নাড়াচাড়া' সাময়িকভাবে সহ্য করতে হবে।  

আধুনিক মনস্তত্ত্ব এবং 'রেজিলিয়েন্স' (Resilience বা মানসিক স্থিতিস্থাপকতা) তত্ত্ব ঠাকুরের এই বাণীর সাথে কিন্তু  হুবহু মিলে যায়:

 মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের তীব্র আধ্যাত্মিক বিশ্বাস থাকে, ট্রমা বা শোকের সময় তাদের মস্তিষ্ক পরিস্থিতিকে দ্রুত গ্রহণ করতে পারে। ঈশ্বরকে ধরে রাখা মানে মনের একটি শক্ত খুঁটি থাকা।

মানুষ যখন একটানা সুখে থাকে, তখন তার মন একঘেয়ে এবং অসচেতন হয়ে পড়ে। জীবনের হঠাৎ আসা ধাক্কা বা 'নাড়াচাড়া' মানুষের অহংকারকে চূর্ণ করে এবং তাকে জীবনের আসল অর্থ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

 

কেন এই নাড়াচাড়া প্রয়োজন?

ঠাকুরের কথামৃতে বিভিন্ন উপমার মাধ্যমে এই তত্ত্বটি চমৎকারভাবে বোঝানো হয়েছে বিভিন্ন উপমা দ্বারা

  • নৌকা জলের উপমা: ঠাকুর বলতেন, নৌকা জলে থাকবে, কিন্তু নৌকার ভেতর যেন জল না ঢোকে। অর্থাৎ, মানুষ সংসারে থাকবে, কিন্তু মন যেন সংসারে তলিয়ে না যায়। সংসারের অশান্তি ঘাত-প্রতিঘাত মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে এই পৃথিবী স্থায়ী নয়।
  • সোনার খাদ বের করা: কাঁচা সোনাকে আগুনে পুড়িয়ে যেমন তার খাদ দূর করা হয়, তেমনি সংসারের দুঃখ-কষ্ট মানুষের মনের কামনা-বাসনার খাদ দূর করে তাকে খাঁটি করে তোলে।
  • ঈশ্বরের শরণাগতি: মানুষ যতক্ষণ নিজের শক্তিতে অহংকারী থাকে, ততক্ষণ ঈশ্বরের দিকে তাকায় না। কিন্তু যখন জাগতিক সমস্ত আশ্রয় ব্যর্থ হয়, তখনই মানুষ অন্তরের তীব্র ব্যাকুলতা যা ঠাকুরের ভাষায় 'ব্যাকুলতা' তাই  নিয়ে ঈশ্বরের শরণাপন্ন হয়। এই দুঃখই তাকে ঈশ্বরের আরও কাছে টেনে নেয়।

 

  • ঠাকুর স্বয়ং যখন ক্যান্সারের মারণ রোগে আক্রান্ত হয়ে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করছিলেন, তখনও তাঁর মন ঈশ্বরের আনন্দে মগ্ন ছিল। তিনি বলতেন"রোগ নিয়ে শরীর থাকুক, হে মন তুমি আনন্দে থাকো।" অর্থাৎ নাড়াচাড়া শরীর মনের উপরিভাগে লেগেছিল, কিন্তু তাঁর আত্মা পরমেশ্বরে স্থির ছিল।
  • ঠাকুরের  এই বাণী আমাদের শেখায় যে জীবনের প্রতিকূল সময়ে ভেঙে না পড়ে সেটিকে একটি 'পরীক্ষা' বা 'মনকে সজাগ করার মাধ্যম' হিসেবে দেখা উচিত।

তাই শ্রীরামকৃষ্ণের এই উপদেশটি কোনো নিছক তত্ত্ব নয়, এটি জীবন পরিচালনার এক মহৌষধ। সংসারে অশান্তি বা দুঃখ আসলে তা দেখে বিচলিত না হয়ে, সেটিকে ঈশ্বরের দেওয়া একটি 'সজাগ বার্তা' হিসেবে গ্রহণ করাই হলো প্রকৃত ভক্তের লক্ষণ। এই নাড়াচাড়াই শেষ পর্যন্ত মানুষকে মোহমুক্ত করে পরম শান্তির পথ দেখায়