আমাদের জীবনে যখন দুঃখ আসে, আমরা ভেঙে পড়ি। আমরা ভগবানকে প্রশ্ন করি— "আমি তো কোনো অন্যায় করিনি, তবে আমার সাথেই কেন এমন হলো?" আমরা হতাশায় ডুবে যাই। কিন্তু আজ থেকে একশত বছর আগে, এই সংসারের বুকে দাঁড়িয়ে এক পরমজননী আমাদের শিখিয়ে গেছেন দুঃখকে দেখার এক সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি আর কেউ নন— পরমারাধ্যা মা সারদাদেবী। মা আমাদের শিখিয়েছেন, সংসারে দুঃখ এলে হতাশ হতে নেই, কারণ— "দুঃখই তো ভগবানের দয়ার দান।"
একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন, মা কেন দুঃখকে ভগবানের ‘দয়ার দান’ বললেন? জাগতিক দৃষ্টিতে যা কষ্ট, আধ্যাত্মিক বা মানসিক দৃষ্টিতে তাই হলো অন্তরের শুদ্ধিকরণ। মা বলতেন, মানুষ যখন সুখে থাকে, তখন সে অহংকার আর ভোগের অন্ধকারের মধ্যে ভগবানকে ভুলে থাকে। কিন্তু যখনই জীবনে চরম দুঃখ বা বিপর্যয় আসে, তখনই মানুষের অহংকার ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়। মানুষ তখন ব্যাকুল হয়ে ঈশ্বরকে ডাকে। এই যে দুঃখ আমাদের ঈশ্বরের চরণের দিকে টেনে নিয়ে যায়, আমাদের মনকে পবিত্র করে— এটাই তো ভগবানের আসল দয়া। মহাভারতের কুন্তীদেবীও কিন্তু ভগবানের কাছে কেবল দুঃখই চেয়েছিলেন, যাতে প্রতি মুহূর্তে শ্রীকৃষ্ণকে মনে রাখা যায়।অনেকে ভাবেন, নিয়মিত পুজো বা ঈশ্বর সাধনা করলে জীবনে বোধহয় কোনো বিপদ আসবে না। মা এই ভুল ধারণাটি এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন— "ভগবানকে ডাকলে যে দুঃখ আসবে না তা নয়।" এই মানবদেহ ধারণ করলে জরা, ব্যাধি এবং সংসারের কষ্ট ভোগ করতেই হবে। স্বয়ং ভগবানও যখন মানুষ রূপে আসেন, তাঁকেও দুঃখের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এটা আমাদের প্রারব্ধ বা কর্মফল।
তাহলে ভগবানকে ডেকে আমাদের লাভ কী? মা আমাদের সেই পরম অভয় দিয়ে বলেছেন— যেখানে তলোয়ারের আঘাত লাগার কথা ছিল, সেখানে ঈশ্বরের কৃপায় একটা সামান্য সুঁচ ফোটার মতো কষ্ট হবে। তিনি বিপদে আমাদের হাত ধরে রক্ষা করবেন। মায়ের ভাষায়— "সেই বিপদ জলের মতন পায়ের তলা দিয়ে চলে যাবে..."
তাই আজ থেকে আমাদের জীবনে যখনই কোনো কঠিন পরিস্থিতি আসবে, আমরা হতাশ হবো না। নিজেকে একা ভাববো না। আমাদের মনে রাখা কর্তব্য
যে মা সারদা আমাদের হাত ধরে আছেন। এই দুঃখকে ভগবানের দেওয়া একটি পরীক্ষা বা তাঁর আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করি, যা আমাদেরকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে এসেছে।
No comments:
Post a Comment