ঠাকুর
বলেছেন 'এক হাতে ঈশ্বরকে
ধরে কাজ করা: ঠাকুর
বলেছেন, সংসারী মানুষদের উচিত এক হাতে
ঈশ্বরের পাদপদ্ম ধরে থাকা এবং
অন্য হাতে সংসারের কাজ
করা; কাজ শেষ হলে
দুই হাতেই ঈশ্বরকে ধরতে হবে। ঠাকুরের এই
রূপকটির অর্থ হলো—সংসারে
কর্মব্যস্ততার মধ্যেও মনের একটি অংশ
সর্বদা ঈশ্বরের চিন্তায় নিয়োজিত রাখা। সংসারের মোহ, দুঃখ এবং
বন্ধন থেকে মনকে মুক্ত
রাখতে ঈশ্বরের শরণাগতি হলো একমাত্র ঢাল।
এক হাতে ঈশ্বরের চরণ ধরে রাখার
অর্থ হলো, জীবনের চূড়ান্ত
লক্ষ্য যে ‘ঈশ্বর লাভ’
বা আত্মিক উন্নতি—তা কোনো অবস্থাতেই
ভুলে না যাওয়া। শ্রীরামকৃষ্ণ কখনোই সংসার
ছেড়ে বনে চলে যাওয়ার
কথা বলেননি। তিনি
কর্মত্যাগের চেয়ে ‘কর্মযোগ’-এর ওপর জোর
দিয়েছেন। পরিবার, সমাজ ও জীবিকার
প্রতি যে দায়িত্ব রয়েছে,
তা আন্তরিকতার সাথে পালন করতে
হবে। মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় থাকে। ঠাকুর
এখানে বয়স ও সময়ের
সাথে আধ্যাত্মিক উত্তরণের একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক
ও মানসিক ক্রম ব্যাখ্যা করেছেন।
যখন বয়স বাড়ে এবং সংসারের
প্রত্যক্ষ দায়িত্বগুলো (যেমন—সন্তানদের বড়
করা বা কর্মজীবন থেকে
অবসর নেওয়া) শেষ হয়, তখন
মনকে সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করতে
হবে। জীবনের শেষভাগে এসে আর কোনো
জাগতিক আসক্তি না রেখে ‘দুই
হাতে’, অর্থাৎ সমগ্র মন ও প্রাণ
দিয়ে পরমাত্মার সাধনায় লীন হওয়াই মানুষের
একমাত্র সার্থকতা।
আজকের তীব্র গতিশীল জীবন, লক্ষ্যহীন প্রতিযোগিতা এবং অবিরাম মানসিক ক্লান্তির যুগে শ্রীরামকৃষ্ণের এই জীবনসূত্রটি মানসিক ভারসাম্য ও শান্তি রক্ষার এক মহৌষধ। এটি আমাদের প্রথাগত বৈরাগ্যের ধারণাকে বদলে দেয়। ঠাকুর স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আত্মিক শান্তি বা আধ্যাত্মিকতার খোঁজে সংসার ত্যাগ করে হিমালয়ের গুহায় যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।বরং, আমরা যেখানে আছি, সেই কর্মক্ষেত্রকেই যদি ‘পবিত্র উপাসনালয়’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তবে জীবন বদলে যায়। নিজের দৈনন্দিন কাজকে কোনো বাধ্যবাধকতা না ভেবে, তাকে যদি সমর্পণ ও সেবার মনোভাব নিয়ে সম্পন্ন করা যায়—এবং ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি না রেখে মনকে এক পরম শক্তির সাথে যুক্ত রাখা যায়—তবেই জীবনের আসল সার্থকতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এটিই আধুনিক মানুষকে মানসিক চাপমুক্ত হয়ে শান্তিতে বাঁচার এবং কর্মের মাঝেই পরম আনন্দ লাভ করার এক নিখুঁত রাজপথ দেখায়।
No comments:
Post a Comment