নমস্কার । ঈশ্বরকে তো আমরা অনেকেই ডাকি, কিন্তু আপনি কি জানেন ঈশ্বর আমাদের ভক্তির গভীরতা অনুযায়ী আমাদের চার ভাগে ভাগ করেছেন? শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম মমতায় চার প্রকার ভক্তের কথা বলেছেন। আর কলিযুগের অবতার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সহজ-সরল কথায় এই চার প্রকার ভক্তের এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আজকের ভিডিওতে আমরা জানবো, এই চার প্রকার ভক্ত কারা । ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত অবশ্যই দেখুন।
প্রথমে জেনে নেওয়া যাক শ্রীকৃষ্ণের সেই বিখ্যাত শ্লোকটি। গীতার সপ্তম অধ্যায়ের ১৬ নম্বর শ্লোকে ভগবান বলছেন—
চতুর্বিধা ভজন্তে মাং জনাঃ সুকৃতিনোঽর্জুন।
আর্তো জিজ্ঞাসুরর্থার্থী জ্ঞানী চ ভরতষভ।।
অর্থাৎ, হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জুন! আর্ত, জিজ্ঞাসু, অর্থার্থী এবং জ্ঞানী—এই চার প্রকার পুণ্যবান ব্যক্তি আমার ভজনা করে থাকেন। আসুন, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের উপলব্ধির আলোয় এই চার প্রকার ভক্তকে আমরা বিস্তারিতভাবে বুঝে নিই।
আর্ত ভক্ত: 'আর্ত' মানে যিনি চরম বিপদে পড়েছেন। রোগ, শোক, দুঃখ বা জাগতিক কোনো বড় সংকটে পড়ে যখন মানুষের আর কোনো উপায় থাকে না, তখন সে পরমেশ্বরের শরণাপন্ন হয়। যেমন—বস্ত্রহরণের সময় দ্রৌপদী বা কুমিরের মুখে পড়া গজেন্দ্র।
শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যাখ্যা: ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, সংসারে যখন তীব্র আঘাত আসে, তখনই মানুষ ঈশ্বরের দিকে ঘোরে। তিনি বলতেন, "সংসারী মানুষ যেন উটের মতো। উট কাঁটাঘাস খায়, মুখ দিয়ে রক্ত পড়ে, তাও কাঁটাঘাস খাওয়া ছাড়ে না।" কিন্তু যখন দুঃখের চাবুক তীব্র হয়, তখন মানুষ কেঁদে বলে, 'হে ভগবান, আমায় রক্ষা করো।' এই কান্নাটাই হলো আর্ত ভক্তের লক্ষণ। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, স্বার্থ থাকলেও এরা পুণ্যবান, কারণ বিপদে পড়ে হলেও তারা অন্য কোথাও না গিয়ে ভগবানের দরবারেই এসেছে।
২. অর্থার্থী ভক্ত: 'অর্থ' মানে শুধু টাকা-পয়সা নয়, জাগতিক যেকোনো চাওয়া-পাওয়া, পদমর্যাদা বা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। যিনি নিজের কোনো উদ্দেশ্য বা কামনা পূরণের জন্য ঈশ্বরের পূজা করেন, তিনিই অর্থার্থী। যেমন—রাজ্য ফিরে পাওয়ার জন্য বালক ধ্রুবের তপস্যা।
শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যাখ্যা: শ্রীরামকৃষ্ণ দেব একে বলতেন 'সকাম ভক্তি' বা 'তামসিক/রাজসিক ভক্তি'। তিনি সুন্দর একটি উদাহরণ দিতেন—কিছু মানুষ আছে যারা ভগবানের কাছে আম-কাঁঠাল, ধন-দৌলত বা বিষয়-আশয় চায়। ঠাকুর বলতেন, রাজার কাছে গিয়ে কি কেউ সামান্য লাউ-কুমড়ো ভিক্ষা চায়? ভগবানের কাছে ভগবানের চেয়ে ছোট কিছু চাওয়াটাই হলো অর্থার্থীর স্বভাব। তবে ঠাকুর এটাও বলতেন, 'মা' যেমন সন্তানের আবদার শোনেন, ঈশ্বরও তেমনি এই ভক্তদের ইচ্ছা পূরণ করেন, যাতে ধীরে ধীরে তাদের মন নিষ্কাম হতে পারে।
জিজ্ঞাসু ভক্ত: 'জিজ্ঞাসু' শব্দের অর্থ যার জানার তীব্র ইচ্ছা আছে। এই ভক্তরা ধন-সম্পদ বা বিপদমুক্তির জন্য ভগবানের কাছে আসেন না। তারা জানতে চান—আমি কে? ঈশ্বর কে? সৃষ্টির রহস্য কী? এদের প্রধান অস্ত্র হলো বিবেক ও বৈরাগ্য। যেমন—স্বয়ং অর্জুন বা রাজা পরীক্ষিৎ।
শ্রীরামকৃণের ব্যাখ্যা: ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এই জিজ্ঞাসু ভক্তদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি নরেন্দ্রনাথ (স্বামী বিবেকানন্দ) বা তাঁর তরুণ শিষ্যদের মধ্যে এই তীব্র ছটফটানি দেখেছিলেন। ঠাকুর বলতেন, "যে ছটফটানি মা-মরা সন্তানের মনের ভেতর হয়, ঈশ্বরের জন্য তেমন ব্যাকুলতা যার জাগে, সেই তো জিজ্ঞাসু।" জগৎকে মিথ্যা জেনে যিনি সত্যের অনুসন্ধান করেন, তিনিই আসল জিজ্ঞাসু।
৪. জ্ঞানী ভক্ত: এই চতুর্থ শ্রেণির ভক্ত হলেন শ্রেষ্ঠ ভক্ত। ইনি ঈশ্বরকে কোনো স্বার্থের জন্য ভালোবাসেন না, কোনো কৌতূহল থেকেও নয়। তিনি জানেন ঈশ্বরই একমাত্র সত্য এবং তিনি ঈশ্বরকে ছাড়া আর কিছুই চান না।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই ভক্তের প্রশংসা করে গীতার
সপ্তম অধ্যায়ের ১৭ নম্বর শ্লোকেই বলেছেন—
তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তিৰ্বিশিষ্যতে।
প্রিয়ো হি জ্ঞানিনোঽত্যর্থমহং স চ মম প্রিয়ঃ।।
অর্থাৎ, এদের মধ্যে অনন্যভক্তি ও আমাতে নিত্যযুক্ত জ্ঞানী ভক্তই শ্রেষ্ঠ। কারণ আমি জ্ঞানীর অত্যন্ত প্রিয় এবং সে-ও আমার অত্যন্ত প্রিয়।
শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যাখ্যা: ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ জ্ঞানী ভক্তের অবস্থা বোঝাতে 'বিজ্ঞানীর' ধারণা দিতেন। তিনি বলতেন, শুধু 'নেতি নেতি' করে ব্রহ্মকে জানাই জ্ঞান নয়। ঈশ্বরকে জেনে তাঁর সাথে প্রেম ভক্তির সম্পর্কে আস্বাদন করাই হলো প্রকৃত অবস্থা। জ্ঞানী ভক্ত জানেন, "যিনিই ব্রহ্ম, তিনিই মা।" তিনি ঈশ্বরের প্রেমে মাতোয়ারা থাকেন, কোনো চাওয়া-পাওয়া ছাড়াই।
তাহলে , আমরা দেখলাম শ্রীকৃষ্ণ এই চার প্রকার ভক্তকেই 'উদার' বা মহান বলেছেন। কারণ তারা যে কারণেই হোক, ঈশ্বরের দিকে মুখ ফিরিয়েছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের কথায়, "নদী যেদিক দিয়েই ঘুরুক না কেন, শেষে গিয়ে তো সাগর সংগ্রহেই মেশে।"