Friday, June 12, 2026

ঠাকুর বলেছেন 'এক হাতে ঈশ্বরকে ধরে কাজ করা

 



ঠাকুর বলেছেন 'এক হাতে ঈশ্বরকে ধরে কাজ করা: ঠাকুর বলেছেন, সংসারী মানুষদের উচিত এক হাতে ঈশ্বরের পাদপদ্ম ধরে থাকা এবং অন্য হাতে সংসারের কাজ করা; কাজ শেষ হলে দুই হাতেই ঈশ্বরকে ধরতে হবে। ঠাকুরের এই রূপকটির অর্থ হলোসংসারে কর্মব্যস্ততার মধ্যেও মনের একটি অংশ সর্বদা ঈশ্বরের চিন্তায় নিয়োজিত রাখা। সংসারের মোহ, দুঃখ এবং বন্ধন থেকে মনকে মুক্ত রাখতে ঈশ্বরের শরণাগতি হলো একমাত্র ঢাল। এক হাতে ঈশ্বরের চরণ ধরে রাখার অর্থ হলো, জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য যেঈশ্বর লাভবা আত্মিক উন্নতিতা কোনো অবস্থাতেই ভুলে না যাওয়া। শ্রীরামকৃষ্ণ কখনোই সংসার ছেড়ে বনে চলে যাওয়ার কথা বলেননি তিনি কর্মত্যাগের চেয়েকর্মযোগ’-এর ওপর জোর দিয়েছেন। পরিবার, সমাজ জীবিকার প্রতি যে দায়িত্ব রয়েছে, তা আন্তরিকতার সাথে পালন করতে হবে। মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় থাকে ঠাকুর এখানে বয়স সময়ের সাথে আধ্যাত্মিক উত্তরণের একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক মানসিক ক্রম ব্যাখ্যা করেছেন। যখন বয়স বাড়ে এবং সংসারের প্রত্যক্ষ দায়িত্বগুলো (যেমনসন্তানদের বড় করা বা কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়া) শেষ হয়, তখন মনকে সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করতে হবে। জীবনের শেষভাগে এসে আর কোনো জাগতিক আসক্তি না রেখেদুই হাতে’, অর্থাৎ সমগ্র মন প্রাণ দিয়ে পরমাত্মার সাধনায় লীন হওয়াই মানুষের একমাত্র সার্থকতা।

আজকের তীব্র গতিশীল জীবন, লক্ষ্যহীন প্রতিযোগিতা এবং অবিরাম মানসিক ক্লান্তির যুগে শ্রীরামকৃষ্ণের এই জীবনসূত্রটি মানসিক ভারসাম্য শান্তি রক্ষার এক মহৌষধ এটি আমাদের প্রথাগত বৈরাগ্যের ধারণাকে বদলে দেয় ঠাকুর স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আত্মিক শান্তি বা আধ্যাত্মিকতার খোঁজে সংসার ত্যাগ করে হিমালয়ের গুহায় যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেইবরং, আমরা যেখানে আছি, সেই কর্মক্ষেত্রকেই যদিপবিত্র উপাসনালয়হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তবে জীবন বদলে যায়। নিজের দৈনন্দিন কাজকে কোনো বাধ্যবাধকতা না ভেবে, তাকে যদি সমর্পণ সেবার মনোভাব নিয়ে সম্পন্ন করা যায়এবং ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি না রেখে মনকে এক পরম শক্তির সাথে যুক্ত রাখা যায়তবেই জীবনের আসল সার্থকতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এটিই আধুনিক মানুষকে মানসিক চাপমুক্ত হয়ে শান্তিতে বাঁচার এবং কর্মের মাঝেই পরম আনন্দ লাভ করার এক নিখুঁত রাজপথ দেখায়

Thursday, June 4, 2026

"দু-চারবার নাড়াচাড়া কিন্তু খেতেই হবে"------শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস


 

ঠাকুর বলতেন, যারা ভগবানকে ধরে থাকে তারা বিষম শোকেও একেবারে তলিয়ে যায় না, তবে "দু-চারবার নাড়াচাড়া কিন্তু খেতেই হবে" শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের এই অমর বাণীটি মানব জীবনের এক পরম মনস্তাত্ত্বিক আধ্যাত্মিক সত্যকে প্রকাশ করে শ্রীম কথিত 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত' গ্রন্থে ঠাকুরের এই ধরনের বহু উপদেশ সংকলিত রয়েছে, যা মানুষের বাস্তব জীবনের টানাপোড়েন এবং ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের গভীর সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করে

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বাস্তববাদী সাধক ছিলেন। তিনি জানতেন যে, রক্ত-মাংসের শরীরে এই সংসারে বাস করতে গেলে দুঃখ, শোক, রোগ এবং অশান্তি অবশ্যই আসবে।

এখানে  "তলিয়ে না যাওয়ার" অর্থ হলো  যিনি ঈশ্বরকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন বা 'ধরে থাকেন', তিনি জীবনের তীব্র ঝড়ে বা বিষম শোকেও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন না। তাঁর অন্তরে একটি সুপ্ত শক্তির আধার থাকে, যা তাঁকে চরম হতাশায় ডুবে যাওয়া (যেমনআত্মহনন বা মানসিক ভারসাম্য হারানো) থেকে রক্ষা করে।

আর "দু-চার বার নাড়াচাড়া" খাওয়ার অর্থ: ঈশ্বরভক্ত হলেই যে জীবনে কোনো দুঃখ আসবে নাঠাকুর এই অলৌকিক বা অবাস্তব সান্ত্বনা দেননি। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী শারীরিক জাগতিক কষ্ট আসবেই, ভক্তকেও সেই ধাক্কা বা 'নাড়াচাড়া' সাময়িকভাবে সহ্য করতে হবে।  

আধুনিক মনস্তত্ত্ব এবং 'রেজিলিয়েন্স' (Resilience বা মানসিক স্থিতিস্থাপকতা) তত্ত্ব ঠাকুরের এই বাণীর সাথে কিন্তু  হুবহু মিলে যায়:

 মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের তীব্র আধ্যাত্মিক বিশ্বাস থাকে, ট্রমা বা শোকের সময় তাদের মস্তিষ্ক পরিস্থিতিকে দ্রুত গ্রহণ করতে পারে। ঈশ্বরকে ধরে রাখা মানে মনের একটি শক্ত খুঁটি থাকা।

মানুষ যখন একটানা সুখে থাকে, তখন তার মন একঘেয়ে এবং অসচেতন হয়ে পড়ে। জীবনের হঠাৎ আসা ধাক্কা বা 'নাড়াচাড়া' মানুষের অহংকারকে চূর্ণ করে এবং তাকে জীবনের আসল অর্থ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

 

কেন এই নাড়াচাড়া প্রয়োজন?

ঠাকুরের কথামৃতে বিভিন্ন উপমার মাধ্যমে এই তত্ত্বটি চমৎকারভাবে বোঝানো হয়েছে বিভিন্ন উপমা দ্বারা

  • নৌকা জলের উপমা: ঠাকুর বলতেন, নৌকা জলে থাকবে, কিন্তু নৌকার ভেতর যেন জল না ঢোকে। অর্থাৎ, মানুষ সংসারে থাকবে, কিন্তু মন যেন সংসারে তলিয়ে না যায়। সংসারের অশান্তি ঘাত-প্রতিঘাত মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে এই পৃথিবী স্থায়ী নয়।
  • সোনার খাদ বের করা: কাঁচা সোনাকে আগুনে পুড়িয়ে যেমন তার খাদ দূর করা হয়, তেমনি সংসারের দুঃখ-কষ্ট মানুষের মনের কামনা-বাসনার খাদ দূর করে তাকে খাঁটি করে তোলে।
  • ঈশ্বরের শরণাগতি: মানুষ যতক্ষণ নিজের শক্তিতে অহংকারী থাকে, ততক্ষণ ঈশ্বরের দিকে তাকায় না। কিন্তু যখন জাগতিক সমস্ত আশ্রয় ব্যর্থ হয়, তখনই মানুষ অন্তরের তীব্র ব্যাকুলতা যা ঠাকুরের ভাষায় 'ব্যাকুলতা' তাই  নিয়ে ঈশ্বরের শরণাপন্ন হয়। এই দুঃখই তাকে ঈশ্বরের আরও কাছে টেনে নেয়।

 

  • ঠাকুর স্বয়ং যখন ক্যান্সারের মারণ রোগে আক্রান্ত হয়ে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করছিলেন, তখনও তাঁর মন ঈশ্বরের আনন্দে মগ্ন ছিল। তিনি বলতেন"রোগ নিয়ে শরীর থাকুক, হে মন তুমি আনন্দে থাকো।" অর্থাৎ নাড়াচাড়া শরীর মনের উপরিভাগে লেগেছিল, কিন্তু তাঁর আত্মা পরমেশ্বরে স্থির ছিল।
  • ঠাকুরের  এই বাণী আমাদের শেখায় যে জীবনের প্রতিকূল সময়ে ভেঙে না পড়ে সেটিকে একটি 'পরীক্ষা' বা 'মনকে সজাগ করার মাধ্যম' হিসেবে দেখা উচিত।

তাই শ্রীরামকৃষ্ণের এই উপদেশটি কোনো নিছক তত্ত্ব নয়, এটি জীবন পরিচালনার এক মহৌষধ। সংসারে অশান্তি বা দুঃখ আসলে তা দেখে বিচলিত না হয়ে, সেটিকে ঈশ্বরের দেওয়া একটি 'সজাগ বার্তা' হিসেবে গ্রহণ করাই হলো প্রকৃত ভক্তের লক্ষণ। এই নাড়াচাড়াই শেষ পর্যন্ত মানুষকে মোহমুক্ত করে পরম শান্তির পথ দেখায়