‘প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণা’
শ্রীসারদা
মঠের প্রথম অধ্যক্ষা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ‘প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণা’। সন্ন্যাস গ্রহণের আগে তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল পারুল মুখোপাধ্যায়, যা পরে সুধীরা দেবী পরিবর্তন করে ‘সরলা’ রেখেছিলেন। স্বামী সারদানন্দ মহারাজ সরলা দেবীকে
যখন তান্ত্রিক মতে কৌল সন্ন্যাস ব্রতে দীক্ষিত করেন, তখন তিনি প্রথমে তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘সারদা’। কিন্তু এই নাম শুনে
যোগিন-মা আপত্তি জানিয়ে বলেন, “আমরা ঐ নামে কি করে ডাকব?” (যেহেতু শ্রীমায়ের নাম ছিল সারদা)। তখন মহারাজ ‘সারদা’ নামের পরিবর্তে তাঁর নাম দেন ‘শ্রীভারতী’। পরবর্তীকালে সন্ন্যাসদীক্ষার পর তাঁর
পূর্ণ নাম হয় ‘প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণা’
আজ সেই পরম সাধিকা ‘প্রব্রাজিকা
ভারতীপ্রাণা’ বা সরলা দেবীর জীবনী কিছু অংশ আলোচনা করছি। সরলা দেবীর নার্সিং শিখতে যাওয়া
নিয়ে গোলাপ-মা যখন আপত্তি করলেন, শ্রীমা বলেছিলেন, “সে কি গোলাপ, শিখে এসে ও আমাদেরই সেবা করবে”। পরবর্তীকালে
এই কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছিল। শ্রীমা সরলা
দেবীর সেবা ও নিষ্ঠায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁর সেবাপরায়ণতা
নিয়ে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। একবার সরলা দেবী যখন ডাফরিন হাসপাতালে নার্সিং
ট্রেনিং নিচ্ছিলেন, তখন শ্রীমা তাঁর অত্যন্ত
সুনিপুণ সেবায় প্রসন্ন হয়ে যোগিন-মাকে বলেছিলেন, “ও যোগীন, সরলা কি কাজই শিখেছে, প্রাণ বাঁচানো কাজ শিখেছে” । অসুস্থতার সময় সরলা দেবী যখন দিনরাত শ্রীমায়ের খাওয়া
এবং শরীরের যত্ন নিতেন, তখন শ্রীমা শিশুসুলভ ভঙ্গিতে
স্বামী সারদানন্দকে বলেছিলেন, “ও (সরলা)
খালি রাতদিন বলবে ‘মা খাও’ ‘মা খাও’ আর বগলে কাঠি দাও।
ঐ দুটোই শিখেছে”। এখানে বলে রাখি কাঠি মানে শ্রীমা থার্মোমিটারকে
বুঝিয়েছেন। এটি শ্রীমায়ের একটি কৌতুকপূর্ণ উক্তি হলেও এর মাধ্যমে সরলা দেবীর
নিরলস সেবার বিষয়টিই ফুটে ওঠে, তিনি সরলা দেবীর সেবায় এতটাই মুগ্ধ
ছিলেন যে তিনি তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “তোমার কোন ভয় নেই, মা” । অসুস্থ অবস্থায় সরলা দেবীর
হাতের দিকে তাকিয়ে শ্রীমা সস্নেহে বলেছিলেন যে, সুস্থ হয়ে তিনি সরলা দেবীকে মোটা সোনার চুড়ি গড়িয়ে দেবেন, যা তাঁর প্রতি শ্রীমায়ের গভীর ভালোবাসা ও সেবার স্বীকৃতিরই
বহিঃপ্রকাশ ।
শ্রীমা সরলা দেবীর সেবাকে এতটাই আপন করে নিয়েছিলেন যে, নিজের অসুস্থতাজনিত বিরক্তির জন্য পরে দুঃখপ্রকাশ করে তাঁকে
বলেছিলেন, “আমি মা, অসুখে ভুগে ভুগে কেমন হয়ে গেছি... আমার কথায় রাগ করো
না, মা”। শ্রীমায়ের এই
সান্নিধ্য ও প্রশংসাই সরলা দেবীর সেবাকে একটি আধ্যাত্মিক সাধনায় উন্নীত করেছিল।
শ্রীসারদা মঠের প্রথম অধ্যক্ষা হিসেবে সরলা দেবীর (প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণা)
ভূমিকা ও তাঁর দায়িত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য।১৯৫৪
সালের এপ্রিল মাসে শ্রীমায়ের জন্মশতবার্ষিকী উৎসব চলাকালীন বেলুড় মঠের তৎকালীন
অধ্যক্ষ স্বামী শঙ্করানন্দ মহারাজ সরলা দেবীকে শ্রীসারদা মঠের দায়িত্ব নেওয়ার নির্দেশ
দেন। সরলা দেবী প্রথমে নিজের অক্ষমতা
প্রকাশ করলে মহারাজ তাঁকে উৎসাহ দিয়ে বলেন যে, শ্রীমায়ের ওপর নির্ভর করলে সব সম্ভব হবে । তিনি আরও বলেন, সরলা দেবী শ্রীমায়ের কাছে থেকে যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
পেয়েছেন, তা যেন তিনি মঠের মেয়েদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। ১৯৫৪ সালের ২ ডিসেম্বর দক্ষিণেশ্বর মন্দির সংলগ্ন গঙ্গাতীরে শ্রীসারদা মঠের
উদ্বোধন হয় এবং সরলা দেবী ‘প্রব্রাজিকা
ভারতীপ্রাণা’ নামে প্রথম অধ্যক্ষা হিসেবে অভিষিক্ত হন । অধ্যক্ষা থাকাকালীনও
তিনি অত্যন্ত অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। শ্রীমায়ের
সেই অমূল্য বাণী— “যখন যেমন তখন তেমন, যেখানে যেমন সেখানে তেমন, যাকে যেমন তাকে তেমন”— তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিফলিত হতো।অধ্যক্ষা হিসেবে তিনি ছিলেন সংস্কারমুক্ত মনের অধিকারী এবং
যেকোনো পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর ছিল। একবার কন্যাকুমারী তীর্থভ্রমণের সময় এক প্রকাশ্য হলের
ডাইনিং টেবিলে অন্যদের সাথে বসে খাবার খাওয়ার মতো অপ্রচলিত পরিস্থিতিতেও তিনি
বিচলিত না হয়ে সহজভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। যুক্তিপূর্ণ ও সহজ উপায়ে জটিল সমস্যার সমাধান করার এই গুণটি
তিনি শ্রীমায়ের কাছ থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন।তাঁর জীবন ছিল অদ্বৈতবোধে
প্রতিষ্ঠিত। শ্রীসারদা মঠের প্রথম অধ্যক্ষা হিসেবে তিনি শ্রীমায়ের
আদর্শ ও ভাবধারাকে নতুন প্রজন্মের সন্ন্যাসিনীদের মধ্যে সঞ্চারিত করার ক্ষেত্রে এক
অনন্য দিশারীর ভূমিকা পালন করেছিলেন।শ্রীমায়ের দেহত্যাগের পর এবং পরবর্তীতে স্বামী সারদানন্দের
মহাপ্রয়াণের পর সরলা দেবী কয়েকটি বিশেষ কারণে কাশীতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।মূলত তাঁর গুরু স্বামী
সারদানন্দের কাশীতে অবস্থানের দৈব ইঙ্গিত এবং আধ্যাত্মিক সাধনার তীব্র আকাঙ্ক্ষাই
তাঁকে কাশীবাসের সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল
কাশীবাস বা কাশীতে থাকা নিয়ে
স্বামী সারদানন্দ মহারাজের সরাসরি কোনো চিরস্থায়ী নির্দেশের চেয়ে তাঁর সময়োপযোগী
পরামর্শ ও একটি অলৌকিক ঘটনার প্রভাবই সরলা দেবীর কাশীবাসের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা
নিয়েছিল। সরলা দেবী যখন সুধীরা দেবীর সাথে কাশী সেবাশ্রমে
রোগীদের সেবা করার জন্য গিয়েছিলেন, তখন স্বামী
সারদানন্দ মহারাজ তাঁকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই পত্রে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, শ্রীমা রাধুর
জন্য খুব চিন্তা করছেন, তাই সরলা যেন চিঠি পাওয়া মাত্রই
জয়রামবাটীতে ফিরে আসেন । অর্থাৎ, সেই সময় শ্রীমায়ের সেবার
প্রয়োজনে তিনি সরলা দেবীকে কাশীতে থাকতে দেননি। কিন্তু শ্রীমায়ের মহাপ্রয়াণ এবং তাঁর পরম সুহৃদ সুধীরা দেবীর আকস্মিক
মৃত্যুতে সরলা দেবী অত্যন্ত শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। সরলা দেবী যখন শোকাচ্ছন্ন ছিলেন, তখন স্বামী
সারদানন্দ তাঁকে আধ্যাত্মিক পথের দিশা দেখিয়ে বলেছিলেন— “এতদিন মাকে মানবীপে সেবা করেছ, এখন তাঁর স্বরূপ
জানবার চেষ্টা কর”। তিনি সরলা দেবীকে মানবজন্ম
সার্থক করার জন্য ভগবান লাভ করার এবং জগতে একটি আদর্শ রেখে যাওয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন। তাঁর এই নির্দেশ সরলা দেবীকে কাশীর নির্জন তপস্যার জীবনের জন্য মানসিকভাবে
প্রস্তুত করেছিল।
স্বামী
সারদানন্দের মহাপ্রয়াণের দিন স্বামী শিবানন্দ মহারাজ তন্দ্রার ঘোরে শুনতে পান যে
শরৎ মহারাজ (স্বামী সারদানন্দ) বলছেন, “এরা সব রইল। আমি কাশীতে বাবা বিশ্বনাথের কাছে চললুম” । এই কথা শোনার পর সরলা দেবীর মনে গভীর প্রত্যয় জন্মে যে তাঁর গুরু স্বামী
সারদানন্দ নিশ্চয়ই কাশীতেই অবস্থান করছেন। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি তাঁর
বাকি জীবন কাশীতে অতিবাহিত করার সংকল্প করেন।সরলা দেবী যখন স্বামী শিবানন্দ মহারাজের (মহাপুরুষ মহারাজ) কাছে তাঁর এই
ইচ্ছার কথা জানান, তখন মহারাজ তাঁর মানসিক অবস্থা
বুঝতে পেরে সম্মতি দেন। তিনি সরলা দেবীকে পত্রে
লিখেছিলেন যে শ্রীমা, যোগিন-মা, গোলাপ-মা এবং শরৎ মহারাজের সেবা যেহেতু সম্পন্ন হয়েছে, তাই এখন যেন তিনি তাঁদের নাম জপ করে সময় কাটান। জানা যায় যে সরলা দেবী কাশীর লাকসা অঞ্চলের একটি
অনাড়ম্বর প্রকোষ্ঠে দীর্ঘ সাতাশ বছর অবস্থান করেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে জীবনযাপন করতেন এবং কঠোর তপস্যা ও জপ-ধ্যানে
নিমগ্ন থাকতেন। তাঁর জীবন ছিল তপস্যা ও কঠোর কৃচ্ছসাধনে পূর্ণ। নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি তাঁর কোনো চাহিদা ছিল না।নিজের কোনো চাহিদা না থাকলেও অন্যের সুযোগ-সুবিধার প্রতি তিনি সবসময় সজাগ থাকতেন।
প্রয়োজনমতো কাশীর অল্পবয়স্কা বিধবা বা দুঃস্থ
মহিলাদের তিনি নানাভাবে সাহায্য
করতেন।এমনকি কাশীতে অবস্থানকালেও তিনি শ্রীমায়ের নাতনি রাধুর অসুস্থতার সময় তাঁর
সেবার ভার নিয়েছিলেন। রাধু যখন জয়রামবাটীতে ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন, তখন সরলা দেবী তাঁকে কাশীতে থাকার জন্য অনেক বুঝিয়েছিলেন, যদিও রাধু শেষ পর্যন্ত সেখানে থাকেননি। কাশীতে সরলা দেবীর দিনগুলো কাটত একদিকে গভীর
আধ্যাত্মিক সাধনায় এবং অন্যদিকে আর্তমানবতার সেবায়, যা তিনি শ্রীমায়ের সান্নিধ্য
থেকে শিক্ষা পেয়েছিলেন।মহাসমাধির কয়েকদিন আগে এক ভক্ত মহিলাকে দেওয়া তাঁর
শেষ উপদেশ ছিল— “কেউ পর নয় মা, জগৎ তোমার!”। অধ্যক্ষা হিসেবে তাঁর এই বার্তা
ও প্রার্থনা ছিল জগতের সকলের মঙ্গল এবং অবিদ্যার বিনাশ।











































































































































































































































































































































































































